ঋণপত্র ছাড়াই কেনাবেচা চুক্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রকাশিতঃ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০২ পিএম
ঋণপত্র ছাড়াই কেনাবেচা চুক্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রদেয় তথ্যাবলির তথ্যসূত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা সার্কুলার। সার্কুলারে বর্ণিত সকল সিদ্ধান্ত যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গত ২৪ আগস্ট ঘোষিত আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ বাস্তবায়ন, উন্মুক্ত হিসাব ব্যবস্থার সংযোজন, ব্যাক-টু-ব্যাক সুবিধার প্রয়োগ, সীমা অপসারণ এবং ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এর কার্যকর থাকার ঘোষণাগুলো সত্য এবং নির্ভুল।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এখন থেকে যেকোনো ধরনের ঋণপত্র খোলা ছাড়াই কেবল বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য আমদানি করতে পারবেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করে দেশের সকল অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক শাখাগুলোতে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধিত হবে এবং আমদানিকারকদের দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং জটিলতার অবসান ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে। সেই প্রজ্ঞাপনের আলোকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বাস্তবায়নী নির্দেশনা দিল। পূর্ববর্তী নীতিমালায় চুক্তিপত্রের মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনায় নির্দিষ্ট অর্থসীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও নতুন আদেশে সেই বাধা পুরোপুরি দূর করা হয়েছে। এখন থেকে শিল্পখাত কিংবা বাণিজ্যিক খাত—উভয় খাতের জন্যই কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যেকোনো আমদানিযোগ্য পণ্য কোনো ধরণের মূল্যসীমা ছাড়া সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে আনয়ন করা যাবে।
উন্মুক্ত হিসাব ব্যবস্থা ও নগদ প্রবাহের স্বস্তি:
নতুন এই পদ্ধতির মূল আকর্ষণ হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত উন্মুক্ত হিসাব বা ওপেন অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন। এর মাধ্যমে বিদেশি সরবরাহকারীদের সাথে চুক্তি করে পণ্য বুঝে পাওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী সুবিধাজনক সময়ে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবেন দেশের উদ্যোক্তারা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঋণপত্র খুলতে যেসব অতিরিক্ত ব্যাংক কমিশন, জামানত বা নগদ অর্থ আটকে রাখার প্রয়োজন হতো, এই পদক্ষেপে তা থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তি পাবেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নগদ অর্থের সচলতা বজায় থাকবে এবং ব্যবসায়ের পরিচালনা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
আইনি পরিপালন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি:
যদিও ব্যাংক গ্যারান্টি বা ঋণপত্রের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে, তবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আইনের কঠোর প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, চুক্তিভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রেও প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত যাবতীয় আইনি বিধিবিধান, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত নিয়মাবলী ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলতে হবে। প্রতিটি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তারা পণ্য ছাড়করণ এবং অর্থ প্রেরণের সময় আমদানি নীতি আদেশের প্রতিটি ধারা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতিমালা সঠিকভাবে পরিপালন নিশ্চিত করে।
রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের বিশেষ সুবিধা ও কাঁচামাল সংগ্রহ:
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা। বাণিজ্য আদেশের অনুচ্ছেদ ২৫ এর আওতায় রপ্তানিমুখী পোশাক খাত ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে দেশীয় মুদ্রায় উপকরণের যোগান নিতে পারবে। পাশাপাশি বিশ্বমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিনামূল্যে বা কোনো প্রকার মূল্য পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল সংগ্রহের আইনি পথ সুগম হলো। বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও এখানে সংযোজিত হয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান:
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মাবলী এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে এই সংস্কারকে দেখা হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে আধুনিক বিশ্ব যে ধারায় বাণিজ্য পরিচালনা করে, বাংলাদেশ সেই পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। এই পরিবর্তনের ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের বাংলাদেশমুখী হবার আগ্রহ বাড়বে এবং দ্রুততম সময়ে বন্দরে পণ্য নিয়ে আসা সম্ভব হবে। স্থানীয় বাজার তৈরি, কাঁচামালের যোগান অক্ষুণ্ণ রাখা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও এটি পরোক্ষ অবদান রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের জারিকৃত নির্দেশনাতে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে এই আমদানি নীতি আদেশ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই দীর্ঘ মেয়াদে দেশের বাণিজ্যিক খাতে এক ধরনের স্থায়িত্ব আসবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে সাহস পাবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে সরকার কর্তৃক নতুন কোনো সংশোধনী জারি না হলে বর্তমানের এই কাঠামোগত সুবিধাই চূড়ান্ত ব্যবস্থা হিসেবে বলবৎ থাকবে। এটি দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।