কুমিল্লা থেকে কর্নেল, স্বপ্নপূরণের পথে পবিত্র সিংহ সাগরের অনন্য যাত্রা

কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট হয়ে নিউইয়র্ক—বৃত্তি, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন পবিত্র সিংহ সাগর

কুমিল্লা থেকে কর্নেল, স্বপ্নপূরণের পথে পবিত্র সিংহ সাগরের অনন্য যাত্রা

কুমিল্লা থেকে কর্নেল, স্বপ্নপূরণের পথে পবিত্র সিংহ সাগরের অনন্য যাত্রা


কুমিল্লায় শিক্ষাজীবনের শুরু, চট্টগ্রামে শৈশব-কৈশোর, সিলেটে উচ্চশিক্ষা। এরপর বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন। আর এবার বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন পবিত্র সিংহ সাগর।

একজন মানুষের সাফল্যের গল্প কখনো শুধু একটি ডিগ্রি কিংবা একটি চাকরির গল্প নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করার মানসিকতা, নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। পবিত্র সিংহ সাগরের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পথচলাও তেমনই একটি দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণাদায়ী যাত্রা।

পবিত্র সিংহ সাগরের শিক্ষাজীবনের শুরু হয়েছিল কুমিল্লায়। এরপর শৈশব থেকে কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। সেখানেই সম্পন্ন করেন স্কুলজীবন। পরিচিত সেই শহরে বেড়ে ওঠার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে ফিরে যেতে হয় নিজের জেলা সিলেটে।

সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বন, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের একাডেমিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে একই বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তাঁর একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তালিকায় তাঁর নামও ছিল। এটি তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করার পর শুরু হয় তাঁর পেশাজীবনের নতুন অধ্যায়। দেশের কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে তিনি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একাডেমিক জীবনে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি এই সময় তাঁর পেশাগত দক্ষতাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

দেশে কাজ করার সময়ই নিজের দক্ষতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাও শক্তিশালী হতে থাকে। সেই লক্ষ্য থেকেই ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন।

অবশেষে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান পবিত্র সিংহ সাগর। পরিচিত শহর, পরিচিত মানুষ এবং দীর্ঘদিনের স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশে নতুন জীবন শুরু করা সহজ ছিল না। নতুন সমাজ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভিন্ন ধরনের কর্মপরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল তাঁর সামনে।

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজ অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ফরেস্ট্রি থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরিবেশ ও বনবিষয়ক এই উচ্চশিক্ষা তাঁর আগের একাডেমিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

বাংলাদেশে বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার পর যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ফলে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার পরিবেশ তাঁকে নিজের বিষয়কে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পথচলা শুধু শ্রেণিকক্ষ ও ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি দুটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও পান তিনি। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন দেশের কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন, অন্যদিকে নিজের পেশাগত দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে প্রয়োগ করার সুযোগ পান।

নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি, উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সময়টি তাঁর জীবনে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। এরপর তাঁর পথচলায় যুক্ত হয় আরও একটি বিশেষ নাম—কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লীগের সদস্য এবং বিশ্বের অন্যতম পরিচিত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইথাকা শহরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত।

এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবনের সুযোগ পাওয়া পবিত্র সিংহ সাগরের দীর্ঘ শিক্ষাগত ও পেশাগত পথচলায় নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কুমিল্লায় শুরু হওয়া শিক্ষাজীবন থেকে চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবন—প্রতিটি ধাপই যেন তাঁকে পরবর্তী বড় সুযোগের জন্য প্রস্তুত করেছে।

তাঁর এই পথচলার দিকে তাকালে দেখা যায়, সাফল্য এসেছে ধাপে ধাপে। প্রথমে নিজের দেশে শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি, এরপর উচ্চশিক্ষা, ফেলোশিপের স্বীকৃতি, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও কাজের সুযোগ—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে তাঁর বর্তমান অবস্থান।

এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের ভালোবাসা ও ত্যাগ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং বন্ধুদের অনুপ্রেরণাকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখেন পবিত্র সিংহ সাগর। একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাঁর পথচলায় সেটিই যেন প্রতিফলিত হয়েছে।

কুমিল্লায় শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি, চট্টগ্রামে শৈশব ও কৈশোর। এরপর নিজের জেলা সিলেটে ফিরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন। আর সবশেষে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়।

পেছনে তাকালে প্রতিটি শহর, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাই যেন তাঁর পরবর্তী পথচলার জন্য একটি করে সিঁড়ি তৈরি করেছে।

পবিত্র সিংহ সাগরের গল্প তাই শুধু একজন ব্যক্তির বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি স্বপ্নকে ধাপে ধাপে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার গল্প। নিজের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, সিলেট থেকে নিউইয়র্ক—আর নিউইয়র্ক থেকে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়। পবিত্র সিংহ সাগরের পথচলা মনে করিয়ে দেয়, বড় কোনো অর্জন হঠাৎ করে আসে না। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ, প্রতিটি অভিজ্ঞতা এবং প্রতিটি সংগ্রাম একসময় মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে স্বপ্নের নতুন ঠিকানায়।